ইমান্দারের হায়াত ও মউত।

বিশ্বাসীর মৃত্যু তার সাথে আল্লাহর সাক্ষাতের দুয়ার

জন্মের সাথে মৃত্যু অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। দু’টির কোনটির ক্ষমতা মানুষের হাতে নেই। আল্লাহর হুকুমেই জন্ম হয়। আল্লাহর হুকুমেই মৃত্যু হয়। কখন হবে, কোথায় হবে, কিভাবে হবে, তা কারো জানা নেই। জীবনের সুইচ তাঁরই হাতে, যিনি জীবন দান করেছেন। অতঃপর জীবনদাতার সামনে হাযিরা দিয়ে জীবনের পূর্ণ হিসাব পেশ করতে হবে। হিসাব শেষে জান্নাত বা জাহান্নাম নির্ধারিত হবে ও সেখানেই চিরকাল শান্তিতে বাস করবে অথবা শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহ বলেন

,كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلاَّ مَتَاعُ الْغُرُورِ- ‘

প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে এবং ক্বিয়ামতের দিন তোমরা পূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। অতঃপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে ও জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে ব্যক্তি সফলকাম হবে। বস্ত্ততঃ পার্থিব জীবন প্রতারণার বস্ত্ত ছাড়া কিছুই নয়’
(সুরা আলে ইমরানঃ১৮৫)

দুনিয়ার এ চাকচিক্যে আমরা পরকালকে ভুলে যাই। অথচ নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল শেষে আমাদের সেখানে যেতেই হবে। কেউ আমাকে জগত সংসারে ধরে রাখতে পারবে না। আল্লাহ বলেন

وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَن تَمُوتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ كِتَابًا مُّؤَجَّلًا ۗ وَمَن يُرِدْ ثَوَابَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَن يُرِدْ ثَوَابَ الْآخِرَةِ نُؤْتِهِ مِنْهَا ۚ وَسَنَجْزِي الشَّاكِرِينَ

আর আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ মরতে পারে না-সেজন্য একটা সময় নির্ধারিত রয়েছে। বস্তুতঃ যে লোক দুনিয়ায় বিনিময় কামনা করবে, আমি তাকে তা দুনিয়াতেই দান করব। পক্ষান্তরে-যে লোক আখেরাতে বিনিময় কামনা করবে, তা থেকে আমি তাকে তাই দেবো। আর যারা কৃতজ্ঞ তাদেরকে আমি প্রতিদান দেবো।
(সুরা আলে ইমরানঃ১৪৫)

তিনি বলেন,

إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ

নিশ্চয় আল্লাহর কাছেই কেয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং গর্ভাশয়ে যা থাকে, তিনি তা জানেন। কেউ জানে না আগামীকল্য সে কি উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন দেশে সে মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।
(সুরা লোকমানঃ৩৪)

তিনি আরও বলেন, …

فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لاَ يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلاَ يَسْتَقْدِمُونَ- ‘…

অতঃপর যখন সেই সময়কাল এসে যায়, তখন তারা সেখান থেকে এক মুহূর্ত আগপিছ করতে পারে না’
(সুরা নাহলঃ৬১)

দুনিয়ার পাগলেরা সুদৃঢ় ও সুউচ্চ প্রাসাদসমূহ নির্মাণ করে। অথচ তাকে চলে যেতে হবে সব ছেড়ে মাটির গর্তে। যেখানে তার নীচে, উপরে, ডাইনে ও বামে থাকবে স্রেফ মাটি। যা থেকে সে সারা জীবন গা বাঁচিয়ে চলেছে। অথচ আল্লাহ বলেন,

أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِكْكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنْتُمْ فِي بُرُوجٍ مُشَيَّدَةٍ ‘

তোমরা যেখানেই থাক না কেন; মৃত্যু কিন্তু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই। যদি তোমরা সুদৃঢ় দূর্গের ভেতরেও অবস্থান কর, তবুও।
(সুরা নিসাঃ ৭৮)

মৃত্যু ঈমানদারের জন্য উপহারস্বরূপ। একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো, মৃত্যু পরকালের অনন্ত সুখ লাভের সিঁড়িমাত্র। তাই প্রকৃত মুসলমান মৃত্যুকে সানন্দে বরণ করে নেয়।

সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) পারস্য সম্রাটের দরবারে প্রবেশ করেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি দৃঢ়স্বরে বলে ওঠেন, ‘হে সম্রাট! আপনার এখানে আমি এমন এক জাতি নিয়ে এসেছি, যারা মৃত্যুকে তেমনি ভালোবাসে, যেমনি ভালোবাসে জীবনকে।’

অতীতের মুসলিম মনীষীদের সামনে পাপের উপাদান ও ভোগের উপকরণ পেশ করা হতো। কিন্তু তাঁরা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না। তাঁদের মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হতো। তাঁরা তাতে বিচলিত হতেন না। মৃত্যুকে তাঁরা বরণ করে নিতেন হাসিমুখে। তাঁদের কাছে তাঁদের প্রতিপালকের সন্তুষ্টিই সব কিছুর ওপরে স্থান পেত।

ইবনে কাসির (রহ.) বর্ণনা করেছেন, একবার ওমর (রা.) রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য একটি বাহিনী পাঠিয়েছেন। ওই বাহিনীতে আবদুল্লাহ বিন হোজায়ফা (রা.) নামে একজন যুবক সাহাবি ছিলেন। মুসলমান ও রোমানদের মধ্যে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। রোম সম্রাট মুসলমানদের অবিচলতা ও মৃত্যুর প্রতি থোড়াই কেয়ার দেখে বিস্মিত হন। তাই কিছু মুসলমান বন্দি হওয়ার পর সম্রাট একজন বন্দিকে তাঁর সামনে হাজির করতে বলেন। তারা আবদুল্লাহ বিন হোজায়ফা (রা.)-কে টেনেহিঁচড়ে সম্রাটের সামনে নিয়ে আসে। তাঁর হাতে হাতকড়া ও পায়ে বেড়ি পরানো ছিল। সম্রাট তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তাঁর বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা দেখে মুগ্ধ হন।

তিনি তাঁকে বলেন, তুমি খ্রিস্টান হও, তাহলে তোমাকে এই বন্দিশালা থেকে মুক্তি দেব। আবদুল্লাহ (রা.) দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন। এবার সম্রাট বলেন, তুমি খ্রিস্টান হলে আমার সাম্রাজ্যের অর্ধেক তোমাকে দিয়ে দেব। তোমাকে আমার সঙ্গে রাজত্বে অংশীদার করব। আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম, আপনি যদি আপনার সাম্রাজ্য, আপনার পূর্বপুরুষের সাম্রাজ্য ও আরব-অনারবের সব সাম্রাজ্য আমাকে এই শর্তে দেন যে আমি আমার ধর্ম থেকে সামান্য সময়ের জন্য ফিরে আসব, তবু আমি তা করব না।সম্রাট ক্রোধান্বিত হয়ে বলেন, তাহলে আমি তোমাকে হত্যা করব। তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমি রাজি। তাহলে আমাকে হত্যা করুন।

সম্রাট তাঁকে টেনে নিয়ে যেতে বলেন। অতঃপর লোকেরা তাঁকে টেনে নিয়ে যায়। তারা তাঁকে একটি উঁচু স্থানে বেঁধে রাখে। সম্রাট তীরন্দাজ বাহিনীকে নির্দেশ দেন তাঁর চারপাশে এমনভাবে তীর নিক্ষেপ করতে, যেন তাঁর শরীরে তীর না লাগে। আর তিনি এই ফাঁকে তাঁর কাছে খ্রিস্টধর্ম উপস্থাপন করতে লাগলেন। কিন্তু আবদুল্লাহ (রা.) তাঁর দিকে ভ্রুক্ষেপও করেননি। তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনতে লাগলেন। সম্রাট তাঁর ঈমানের অবিচলতা দেখে তাঁকে জেলখানায় বন্দি করে রাখতে বলেন।

সৈন্যরা বাঁধ খুলে তাঁকে জেলে নিয়ে যায়। সম্রাট তাঁকে দানা-পানি দিতে নিষেধ করেন। একপর্যায়ে ক্ষুধায় কাতর হয়ে তিনি মৃত্যুর কাছাকাছি পৌছে যান।এ অবস্থায় তারা তাঁর সামনে মদ ও শূকরের গোশত উপস্থিত করে। আবদুল্লাহ (রা.) তা দেখে বলেন, আল্লাহর শপথ! আমার জানা আছে, এ অবস্থায় এই খাদ্য গ্রহণ করা আমার জন্য বৈধ। কিন্তু আমি চাই না, আমার মাধ্যমে কাফিররা আনন্দিত হোক। তাই তিনি সেই খাদ্যগুলো ছুঁয়েও দেখেননি। সম্রাট এ খবর শুনে তাঁর সামনে উত্তম খাবার পরিবেশনের নির্দেশ দেন। অতঃপর সম্রাট তাঁর কাছে একজন সুন্দরী নারী পাঠাতে বলেন। ওই নারীকে বলা হলো, তাঁকে যেন ব্যভিচারে বাধ্য করা হয়। ওই রূপসী তাঁকে ব্যভিচারে বাধ্য করার জন্য সব কলাকৌশল অবলম্বন করে। কিন্তু তিনি তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করেননি। অবশেষে ওই নারী নিরাশ হয়ে বেরিয়ে আসে। তার ভাষ্য হলো, আল্লাহর কসম! আপনারা আমাকে এমন পুরুষের কাছে পাঠিয়েছেন, আমার জানা নেই, তিনি পুরুষ নাকি পাথর। সম্ভবত সেও জানে না, আমি নারী নাকি পুরুষ। সম্রাট সব চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শেষ চেষ্টায় মনোনিবেশ করেন। তিনি একটি পিতলের হাঁড়িতে তেল গরম করতে বলেন।

এরপর আবদুল্লাহ বিন হোজায়ফা (রা.)-কে তার সামনে দাঁড় করান। একজন মুসলিম বন্দিকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ওই ফুটন্ত তেলে নিক্ষেপ করা হয়, মুহূর্তের মধ্যে তাঁর দেহ তেলের সঙ্গে মিশে যায়। হাড়গুলো তেলের ওপর ভাসতে থাকে। আবদুল্লাহ বিন হোজায়ফা (রা.) তা স্বচক্ষে অবলোকন করেন। সম্রাট আবার তাঁকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে বলেন। কিন্তু যথারীতি তিনি অস্বীকৃতি জানান। সম্রাটের ক্রোধ আরো বেড়ে যায়।

তাই এবার তিনি তাঁকেই ফুটন্ত তেলে নিক্ষেপ করতে বলেন। সৈন্যরা যখন তাঁকে টেনে হাঁড়ির কাছে নিয়ে যায়, তিনি আগুনের উত্তাপ অনুভব করেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি কেঁদে ফেলেন। সম্রাট ভাবেন, তিনি ভয় পেয়েছেন। তাই আনন্দিত হয়ে তিনি বলেন, তুমি খ্রিস্টান হও, আমি তোমাকে অর্ধরাজ্য দিয়ে দেব। তিনি আগের মতো অস্বীকৃতি জানান।তাহলে তার কান্নার হেতু কী?

আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, আমি কাঁদছি এই জন্য যে, আমার জীবন মাত্র একটি। এই জীবন এই হাঁড়িতে নিক্ষেপ করার সঙ্গে সঙ্গে নিঃশেষ হয়ে যাবে। অথচ আমি মনেপ্রাণে কামনা করি, যদি আমার ১০০ জীবন হতো, আর আমি প্রতিটি জীবন আজকের মতো আল্লাহর পথে দিতে পারতাম। তখন সম্রাট বলেন, তুমি আমার মাথায় চুম্বন করো, তাহলে আমি তোমাকে ছেড়ে দেব। আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, তাহলে আপনার কাছে থাকা সব মুসলিম বন্দিকে ছেড়ে দিতে হবে। সম্রাট বলেন, ঠিক আছে। আবদুল্লাহ (রা.) তাঁর কথা রাখেন। তিনি সম্রাটের মাথায় চুম্বন করেন। অতঃপর তাঁর সঙ্গে সব বন্দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

প্রসঙ্গক্রমে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কথা মনে পড়ে গেল। মৃত্যুর কিছুকাল আগে তার সঙ্গী-সাথীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন- মৃত্যুর পর তার হাত দুটো যেন কফিনের বাইরে বের করে রাখা হয়। যাতে করে সমস্ত পৃথিবীর মানুষ দেখতে পায় অর্ধেক পৃথিবীর যিনি অধীশ্বর তিনি আজ কবরে যাচ্ছেন একেবারে শূন্য হাতে। অন্যদিকে কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনের বিশাল আবিষ্কারক প্রতিভা স্টিভ জোবসের সেই করুণ আর্তির কথা মনে পড়ে। কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় তিনি বলেছিলেন- যদিও আজ আমি হাজার কোটি টাকার মালিক অথচ আমার সব সম্পদ মৃত্যু দেবতার হাতে অর্পণ করেও আরও একটি রাত বেশি বাঁচার কোনো উপায় নেই। অথচ কে বলবে এ স্টিভ জোবসই ২০০৫ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন ভাষণে মৃত্যু নিয়ে রসিকতা করে বলেছিলেন- “এই জগতে কেউ মরতে চায় না, এমনকি যারা ভাবে মরে গেলে স্বর্গে যাবে, আর স্বর্গ হচ্ছে দারুণ একটা সুখের জায়গা, তারাও চায় না মরতে।

আল্লাহ স্বীয় নবীকে বলেন, إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ ‘নিশ্চয়ই তুমি মরবে এবং তারাও মরবে’ (যুমার ৩৯/৩০)। বিশ্ব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে আল্লাহ নিজে এবং জিব্রীলকে পাঠিয়ে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। অতএব মৃত্যুর কথা স্মরণ করা ও স্মরণ করিয়ে দেওয়া দু’টিই মুমিনের জন্য অবশ্য কর্তব্য। কেননা দুনিয়ায় লিপ্ত মানুষ মৃত্যুকে ভুলে যায়। এই ফাঁকে শয়তান তাকে দিয়ে অন্যায় করিয়ে নেয়। একারণেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, তোমরা বেশী বেশী করে স্বাদ বিনষ্টকারী বস্ত্তটির কথা স্মরণ কর’।অর্থাৎ মৃত্যুকে স্মরণ কর। যাতে দুনিয়ার আকর্ষণ হ্রাস পায় এবং আল্লাহর প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। সেই সাথে তার দীদার লাভের জন্য হৃদয় ব্যাকুল হয়। মোঃ ইমরান খাঁন ***

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s